বাংলাদেশ থেকে দুবাই: এক্সপোর্ট সেবার সরাসরি শিপমেন্ট প্রস্তুতি
বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই, শারজাহ, আবুধাবি ও কাতারের মার্কেটে প্রতিদিনই যাচ্ছে দেশি সবজি–ফল। এই প্রবণতার ধারাবাহিকতায় “এক্সপোর্ট সেবা” সম্প্রতি দুবাইয়ের আল আবিল মার্কেটমুখী একটি নতুন শিপমেন্ট প্রস্তুতের পূর্ণ প্রক্রিয়া তুলে ধরেছে। প্রতিষ্ঠানটির সিইও জাহিদ হোসাইন নিজেই সরাসরি প্যাকেজিং হাউস থেকে এই কার্যক্রম দেখিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন অভিজ্ঞ সাপ্লায়ার মজিবুর ভাই, যিনি তিন দশকের বেশি সময় ধরে কৃষিপণ্য সাপ্লাইয়ের সঙ্গে যুক্ত।
এই প্রতিবেদনে রয়েছে শিপমেন্টের প্রস্তুতি, পণ্যের উৎস, মান নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য জাহিদ হোসাইনের পরামর্শ।
শ্যামবাজার: দেশের ভেজিটেবল এক্সপোর্টের প্রধান কেন্দ্র
ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শ্যামবাজার শুধু অভ্যন্তরীণ বাজারই নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক সবজি–ফল রপ্তানির একটি প্রধান হাব। এখান থেকেই প্রতিদিন অসংখ্য শিপমেন্টের জন্য পণ্য সংগ্রহ, বাছাই, গ্রেডিং ও প্যাকিং করা হয়।
ভিডিওতে জাহিদ হোসাইন বলেন—
“আমরা এখন শ্যামবাজারে আছি। নতুন যারা এক্সপোর্ট শুরু করতে চান, তাদের জন্য এটি সবচেয়ে ভালো সোর্সিং পয়েন্ট। এখান থেকেই আমাদের প্রায় সব রেগুলার শিপমেন্ট করা হয়।”
১১ ধরনের পণ্য নিয়ে দুবাইমুখী চালান
চালানটিতে মোট ১১ ধরনের কৃষিপণ্য রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
- কাকরোল
- জারা লেবু
- ডাল আলু
- তেঁতুল
- আমড়া
- করলা
- জয়ফল–জলপাই–পেয়ারা
- এবং আরও কয়েকটি মৌসুমি সবজি
প্রতিটি পণ্যের জন্য আলাদা গ্রেডিং ও প্যাকেজিং করা হয় যাতে গন্তব্যে পৌঁছানোর পর পণ্যের সতেজতা বজায় থাকে। কার্টন বক্সগুলোতে পর্যাপ্ত বায়ুচলাচলের ব্যবস্থা থাকে, যাতে দীর্ঘ ফ্লাইটেও পণ্যের গুণগত মান নষ্ট না হয়।
জাহিদ হোসাইন জানান—
“আমরা প্রতিটি পণ্যের জন্য আলাদা প্যাকেজিং করি। আমাদের লক্ষ্য থাকে—যাতে পণ্য শতভাগ ঠিকঠাক অবস্থায় গন্তব্যে যায়।”
পণ্যের উৎস: দেশের বিভিন্ন জেলার বিশেষ কৃষিপণ্য
অভিজ্ঞ সাপ্লায়ার মজিবুর ভাই ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কৃষিপণ্য সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জাহিদ জানতে চান—পণ্যের উৎপত্তিস্থল কোথায়?
মজিবুর ভাই জানান—
- জারা লেবু ও কাকরোল আসে নরসিংদী থেকে
- ডাল আলু আসে বগুড়া থেকে
- তেঁতুল সংগ্রহ করা হয় খাগড়াছড়ি অঞ্চল থেকে
- করলা, আমড়া সহ আরও অনেক পণ্য আসে দেশের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলীয় জেলা থেকে
জাহিদ বলেন—
“আমরা বাংলাদেশের ৬৪ জেলার পণ্যই এক্সপোর্ট করি। প্রতিটি এলাকার পণ্য বিদেশি বাজারে আলাদা পরিচিতি তৈরি করছে।”
দুবাইয়ের আল আবির মার্কেটের জন্য প্রস্তুতি
এই চালানটি যাচ্ছে দুবাইয়ের অন্যতম বড় সবজি–ফল হোলসেল সেন্টার Al Aweer Market–এ। তবে সময়সীমা ও কার্গো সিডিউলের কারণে পণ্যটি যাবে শারজাহ পোর্ট হয়ে, এরপর ট্রাকে মার্কেটে পৌঁছে দেওয়া হবে।
জাহিদ বলেন—
“দুবাইয়ের শিডিউল খুব টাইট থাকে। তাই শারজাহ হয়ে শিপমেন্ট পাঠাই, যাতে সময়মতো মার্কেটে পৌঁছানো যায়।”
বৃহস্পতিবার রাতেই প্যাকেজিং শেষ করতে হয়, কারণ শুক্রবার ভোরেই বেশিরভাগ ফ্লাইটের কাট-অফ টাইম।
প্যাকেজিং: আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার অন্যতম শর্ত
রপ্তানি জগতে প্যাকেজিং শুধু একটি নিয়ম নয়, বরং আন্তর্জাতক মান ধরে রাখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এজন্য এক্সপোর্ট সেবা অনুসরণ করে—
- প্রতিটি পণ্যের আলাদা বাছাই
- আকার ও গ্রেডিং অনুযায়ী প্যাকিং
- আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রিত কার্টন
- ভেন্টিলেশন–ফ্রেন্ডলি বক্স
- প্রয়োজন হলে ফোম–লাইনার
- এয়ারফ্রেট উপযোগী বক্স ডিজাইন
- অভিজ্ঞ শ্রমিকদের মাধ্যমে মনিটরিং
এসব নিশ্চিত করা না হলে বিদেশি বাজারে পণ্যের মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়।
মজিবুর ভাই: ৩০ বছরের অভিজ্ঞ সাপ্লায়ার
মজিবুর ভাইয়ের মতো অভিজ্ঞ সাপ্লায়াররা দেশের কৃষিপণ্য রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তিনি শুধু পণ্য সংগ্রহই করেন না, বরং—
- কোন পণ্য কোন সময় পাওয়া যায়
- কোন এলাকার পণ্য সবচেয়ে ভালো
- কোন ক্রেতা কী ধরনের পণ্যে সন্তুষ্ট
- কোন ধরনের প্যাকেজিং গ্রাহকদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য
—এসব বিষয়েও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
জাহিদ বলেন—
“মজিবুর ভাইয়ের মতো নির্ভরযোগ্য সাপ্লায়ার পাওয়া নতুন ব্যবসায়ীদের জন্য বড় সুবিধা।”
নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য দিকনির্দেশনা
বাংলাদেশে অনেক তরুণই এখন কৃষিপণ্য রপ্তানির দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু শুরুতে তাঁদের বেশ কিছু প্রশ্ন থাকে—
- কোথা থেকে পণ্য সোর্স করব?
- কোন প্যাকেট ব্যবহার করব?
- কীভাবে গ্রেডিং করব?
- কী ধরনের বাজার লক্ষ্য করব?
- কোন শিপমেন্ট রুট ভালো?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে এক্সপোর্ট সেবা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে।
জাহিদ হোসাইন বলেন—
“এক্সপোর্ট শুরুর জন্য যেকোনো ধরনের পরামর্শ আমরা দিয়ে থাকি। প্যাকেজিং, সোর্সিং, মার্কেট ইনফরমেশন—সব কিছুতেই আমরা নবীন উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করি।”তিনি আরও যোগ করেন—
“বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা চাই নতুন উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিষ্ঠিত হোক।”
শ্যামবাজারের প্যাকিং হাউস থেকে শুরু করে দুবাইয়ের আল আবিল মার্কেট পর্যন্ত—বাংলাদেশের কৃষিপণ্য আজ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কৃষকের পরিশ্রম, সাপ্লায়ারের দক্ষতা, এবং রপ্তানি প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা—সব মিলিয়ে বিশ্ববাজারে দেশের অবস্থান প্রতিদিন আরও সুদৃঢ় হচ্ছে।
বাংলাদেশের কৃষিপণ্য শুধু দেশের অর্থনীতিকেই এগিয়ে নিচ্ছে না, বরং দেশের পরিচিতিকেও বিশ্বে নতুন করে তুলে ধরছে।