বাংলাদেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের নতুন অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন মাহফুজুল গনি—‘গনি ক্রিয়েশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা। বিশাল কর্পোরেট ব্যাকগ্রাউন্ড বা পারিবারিক ব্যবসার সমর্থন ছাড়াই শুধুমাত্র নিজের ইচ্ছাশক্তি, শ্রম এবং একটি সঠিক গাইডলাইনের ওপর ভর করেই তিনি বাংলাদেশের হ্যান্ডিক্রাফ্ট শিল্পকে পৌঁছে দিয়েছেন জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে। আর সেই গাইডলাইন এসেছে এক্সপোর্ট সেবা-র প্রশিক্ষণ থেকে।
এই সফলতার গল্প শুধু একজন মানুষের নয়, বরং সম্ভাবনাময় এক খাতের গল্প; যে খাতে ঢুকতে চাইলেও অনেক যুবক-যুবতী ভয় পান ‘রপ্তানি প্রক্রিয়া কঠিন’ মনে করে। মাহফুজুল গণির যাত্রা প্রমাণ করেছে—সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে যেকোনো মানুষই আন্তর্জাতিক বাজারে নিজের জায়গা করে নিতে পারে।
টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার থেকে আন্তর্জাতিক উদ্যোক্তা
মাহফুজুল গনি পেশায় একজন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করেই চাকরিতে প্রবেশ। কিন্তু চাকরির পাশাপাশি মাথায় ঘুরতে থাকে উদ্যোক্তা হওয়ার চিন্তা। তিনি জানান— “চাকরি ভালো চলছিল, কিন্তু মনে হতো আমি অন্য কিছু করতে পারবো। নিজের কিছু করতে হবে—এই ইচ্ছাটাই আমাকে উদ্যোক্তা জীবনে ঠেলে দেয়।” ২০১৩ সালে তিনি ছোট পরিসরে হ্যান্ডিক্রাফ্ট প্রোডাকশন শুরু করেন। তখনো রপ্তানি কী, কিভাবে হয়, কোন ডকুমেন্ট লাগে—এসব সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না। ২০১৫ সাল থেকে তিনি প্রোডাকশন নিয়মিত করেন এবং দেশের কিছু বড় রপ্তানিকারকের কাছে প্রডাক্ট সাপ্লাই দিতে থাকেন। কিন্তু তখনো তিনি নিজে সরাসরি রপ্তানিকারক নন।রপ্তানিতে জ্ঞান ছিল পুরোপুরি শূন্য
মাহফুজুল গনি সৎভাবে স্বীকার করেন—“রপ্তানির বিষয়ে সত্যি সত্যিই আমার জ্ঞান ছিল শূন্য শতাংশ। ব্যাংকে কী ফরম লাগে, ইনভয়েস কেমন হয়, বায়ার খুঁজবো কোথায়—কিছুই জানতাম না।”বড় রপ্তানিকারকদের কাছে কাজ দিতে দিতে তাঁর মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরত— “ওরা যদি পারে, আমি কেন পারবো না?” এই প্রশ্নই তাকে খুঁজতে বাধ্য করে আন্তর্জাতিক রপ্তানির সঠিক পথ।
অনলাইনের একটি বিজ্ঞাপন তাঁর জীবন বদলে দেয়
একদিন মোবাইলে অনলাইনে স্ক্রল করতে করতে তিনি দেখলেন ‘এক্সপোর্ট সেবা’-র একটি বিজ্ঞাপন। কৌতূহলবশত ক্লিক করলেন। কোর্সের ফি তখন মাত্র ৫০০ টাকা। তিনি ভাবলেন—“এই সামান্য টাকায় জ্ঞান বাড়লে ক্ষতি কী?”সেই ভাবনা থেকেই করেন তাঁর প্রথম কোর্স। আর সেই কোর্সই বদলে দেয় পুরো জীবন। পরবর্তীতে তিনি একে একে আরও ট্রেনিং নেন এক্সপোর্ট সেবা থেকে—বেসিক, অ্যাডভান্স, ডকুমেন্টেশন, বায়ার সার্চ, আন্তর্জাতিক প্রাইসিং—সব।
এক্সপোর্ট সেবার প্রশিক্ষণের বিশেষত্ব: হাতে-কলমে বাস্তব অভিজ্ঞতা
মাহফুজুল গনি বলেন—“এক্সপোর্ট সেবা শুধু তথ্য দেয় না—বাস্তবে কিভাবে কাজ করতে হয় সেটা শিখায়। জাহিদ ভাই নিজে বহুদিন এক্সপোর্টে কাজ করেছেন। তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে শেখান—কোথায় ভুল হয়, কিভাবে ঠিক করতে হয়। এটা অন্য কোথাও পায়নি।”তিনি জানান, প্রথম ইনভয়েস তৈরি করা, প্রথম বায়ারকে ইমেইল করা, প্রথম ব্যাংকিং ডকুমেন্ট জমা দেয়া—সবকিছুতেই এক্সপোর্ট সেবা তাঁর পাশে ছিল। “যদি এক্সপোর্ট সেবা না থাকতো, শুরুতেই ভুল করে হয়তো আমি ব্যর্থ হতাম।”
শুরু হলো রপ্তানির নতুন অধ্যায়
দীর্ঘ প্রস্তুতির পর অবশেষে ২০২২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর গনি ক্রিয়েশন প্রথম আন্তর্জাতিক অর্ডার পায়। সেই মুহূর্তটিকে তিনি জীবনের বড় অর্জন হিসেবে দেখেন। এরপর ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫—এই তিন বছর তাঁর ব্যবসা নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যায়। রপ্তানি শুরু হয় ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে।রপ্তানির অগ্রযাত্রা—ধাপে ধাপে সাফল্যের গল্প (বর্ণনামূলক ফ্যাক্ট বক্স)
গনি ক্রিয়েশনের রপ্তানির অগ্রগতি বোঝার জন্য কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা জরুরি:১. প্রথম আন্তর্জাতিক অর্ডার
২০২২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটি বিদেশ থেকে প্রথম অর্ডার পায়। যা ছিল তাঁর ব্যবসার মোড় ঘোরানো মুহূর্ত।২. মোট রপ্তানির পরিমাণ
প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত ১০ লাখ মার্কিন ডলারেরও বেশি পণ্য রপ্তানি করেছে—যা বাংলাদেশের একটি নতুন হ্যান্ডিক্রাফ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য অসাধারণ অর্জন।৩. বার্ষিক গড় রপ্তানি
প্রতি বছর গড়ে ৩ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি রপ্তানি করে গনি ক্রিয়েশন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ পরিমাণ আরও বাড়ছে।৪. সর্বশেষ বড় চালান
সর্বশেষ আন্তর্জাতিক চালানের পরিমাণ ছিল ১,১৪,০০০ USD, যা গনি ক্রিয়েশনের ইতিহাসে অন্যতম বড় শিপমেন্ট।৫. রপ্তানির বর্তমান গন্তব্য
প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে চারটি দেশে নিয়মিত রপ্তানি করছে:- জার্মানি
- ফ্রান্স
- নেদারল্যান্ডস
- যুক্তরাষ্ট্র
প্রাকৃতিক উপাদানে বৈশ্বিক মানের পণ্য
গনি ক্রিয়েশন পরিবেশবান্ধব ন্যাচারাল উপাদান দিয়ে তৈরি হ্যান্ডিক্রাফ্ট পণ্য রপ্তানি করে। ব্যবহৃত উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে—- পাট
- হোগলা পাতা
- বাঁশ
- বেত
- সন
- রিসাইকেল ফ্যাব্রিক
নতুনদের জন্য সতর্কতা ও পরামর্শ
মাহফুজুল গনি পরিষ্কারভাবে বলেন— “এক্সপোর্ট কোনো খেলা না। এখানে ভুল করলে ক্ষতি লাখে হতে পারে। তাই যারা নতুন, তাদের অবশ্যই এক্সপোর্ট সেবার মতো প্রতিষ্ঠানের ট্রেনিং নেওয়া উচিত।” তিনি মনে করেন, যারা উদ্যোক্তা হতে চান বা বৈদেশিক বাজারে পণ্য পাঠাতে চান—তাদের জন্য ‘এক্সপোর্ট সেবা’ একটি নিরাপদ পথচলা।“আমি নিজে প্রমাণ যে, সঠিক গাইডলাইন থাকলে বাংলাদেশ থেকে যেকোনো তরুণও বিশ্ববাজারে সফল হতে পারে।”গনি ক্রিয়েশনের সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়; বরং বাংলাদেশের হ্যান্ডিক্রাফ্ট শিল্পের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। তরুণ উদ্যোক্তাদের কাছে এটি প্রমাণ— জ্ঞান + দিকনির্দেশনা + পরিশ্রম = আন্তর্জাতিক সাফল্য। মাহফুজুল গনির রপ্তানি যাত্রা আজ অনেকের অনুপ্রেরণা, এবং ‘এক্সপোর্ট সেবা’ সেই যাত্রার সহযাত্রী।